বৈশ্বিক সংকট ও বাণিজ্যনীতির চাপ মোকাবেলায় বাণিজ্য চুক্তির প্রতি জোর বিশেষজ্ঞদের

বর্তমান সংকট সাময়িক নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন উল্লেখ করে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের পরিচালক আখতার হোসেন আপুর্ব বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুদ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল প্রয়োজন

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বৈশ্বিক সংকট, পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতি ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা শিল্পখাতে আর্থিক চাপ আরো বাড়াবে এবং প্রধান রপ্তানি বাজারগুলো থেকে ভবিষ্যৎ অর্ডার হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে অভিমত তাদের। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই বাজার বৈচিত্র্যকরণ, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি এবং জ্বালানি ও আর্থিক সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (২ মে) বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল, নিটিং অ্যান্ড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এক্সিবিশন (বিটিকেজি) ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও ইনফোরচেইন ডিজিটাল টেকনোলজি কোং লিমিটেড যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সেমিনারে ইউরোচেম বাংলাদেশ চেম্বারের চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর যদি স্থায়ী বাজার সুবিধার বিকল্প না থাকে, তবে তা বড় ধরনের ধাক্কা হবে। ইইউর সঙ্গে একটি এফটিএ স্থায়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য কাঠামো দেবে, যেখানে জিএসপি প্লাসের মতো জটিল ও অনিশ্চিত ব্যবস্থা নেই।

লোপেজ আরো বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৪ সাল থেকে কার্যকর হয়েছে। ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে তা সরবরাহকারীদের ওপরও প্রযোজ্য হবে।

প্রস্তুতকারকদের আগাম প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুরো ব্যয় কারখানাগুলো একা বহন করতে পারবে না। ক্রেতা, সরকার ও উৎপাদকদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি প্রয়োজন, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।

এসময় ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রিয়াদ মাহমুদ বলেন, শিল্পখাতটি এখন একাধিক কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। আমদানি নির্ভরতা ও বৈশ্বিক সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং শ্রমনির্ভর খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ভবিষ্যৎ রপ্তানি অর্ডার কমিয়ে দিতে পারে, ফলে কারখানাগুলো অপ্রতুল ব্যবহার ও আর্থিক চাপের মুখে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি। বারবার সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা টেকসই নয়। বরং নির্দিষ্ট সংকট মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল গঠন প্রয়োজন বলেও অভিমত তার।

বর্তমান সংকট সাময়িক নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন উল্লেখ করে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের পরিচালক আখতার হোসেন আপুর্ব বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুদ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল প্রয়োজন। ‘জাস্ট ইন টাইম’ স্বল্পমূল্যের সরবরাহ মডেল এখন আর কার্যকর নয়।

গত ২৯ এপ্রিল শুরু হওয়া চার দিনের এ মেলায় প্রায় ২৮টি দেশের ৯ শতাধিক প্রদর্শক অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ছিল কানাডা, চীন, তাইওয়ান, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, হংকং, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

মেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ স্টলে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত যন্ত্রপাতি, ডাই ও কেমিক্যালস, নিটিং ও উইভিং প্রযুক্তি, এমব্রয়ডারি, কাটিং-সেলাই এবং ওয়াশিং ও ড্রাই ক্লিনিং সমাধান প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়।

এক্সপোতে মোট চারটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ। উপস্থিত ছিলেন ইনফোরচেইন সিইও স্পেন্সার লিন।

আরও